ঢাকা, শনিবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৭

সংবাদ শিরোনাম 

বিভাগীয় সংবাদ : রাজশাহী চিনিকলে আখ মাড়াই শুরু * জয়পুরহাটে ৮ শ ১৪ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা *হাইব্রিড মরিচ চাষে বগুড়ার সারিয়াকান্দির চাষিদের মুখে হাসি   |    আন্তর্জাতিক সংবাদ : হারিরির সৌদি আরব ত্যাগ * দুর্নীতির দায়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক দুই গোয়েন্দা প্রধান গ্রেপ্তার   |    জাতীয় সংবাদ : দেওয়ান ফরিদ গাজীর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল * সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক সমাবেশ কোন রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি সমাবেশ নয় : ওবায়দুল কাদের   |   

বঙ্গবন্ধু ১৯৭০র ১৪ নভেম্বর পিরোজপুর থেকে ভোলার দুর্গত মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন

পিরোজপুর, ১৪ নভেম্বর ২০১৭ (বাসস) : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০র ১৪ নভেম্বর পিরোজপুর থেকে ভোলায় দুর্গত মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত ৭ বার পিরোজপুরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে এলেও নিভৃত পল্লী মাটিভাঙ্গার বিশাল জনসভার খবরটি অনেকটাই স্মৃতির আড়ালে রয়ে গেছে।
১৯৭০ সালের ১৪ নভেম্বর সে সময়ের পিরোজপুর মহাকুমার নাজিরপুর থানার মাটিভাঙ্গা কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রধান অতিথির ভাষণ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর টুুঙ্গিপাড়ার বাড়ি থেকে অনতি দূরে মধুমতি নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এ কলেজের মাঠে সেদিন তিল ধারনের ঠাঁই ছিলো না। সে অঞ্চলে তখন রাস্তা-ঘাট না থাকলেও পায়ে হেঁটে ও নৌকায় চড়ে লাখো মানুষ জনসভা স্থলে উপস্থিত হয়েছিল।
মাটিভাঙ্গা অঞ্চলের নারীরা তখন কোন রাজনৈতিক সভায় না গেলেও সেদিন হাজার হাজার নারী তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য জনসভা মাঠে উপস্থিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বাড়ি থেকে স্পিড বোটে চড়ে মধুমতি নদী পাড়ি দিয়ে বলেশ্বর নদের তীরের কলেজ ঘাটে নেমে সফর সঙ্গীদের নিয়ে জনসভার মঞ্চে আরোহন করেন। এ সময় জনতা জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু গগণ বিদারী স্লোগানে সমগ্র এলাকা মুখরিত করে তোলে।
নাজিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুর মোহাম্মদ ফরাজীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় নাজিরপুর-স্বরূপকাঠী-বানারিপাড়া থানা নিয়ে গঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী শেরেবাংলার পুত্র এ কে ফয়জুল হক, নাজিরপুর-বানারিপাড়া থানা নির্বাচনী এলাকার প্রাদেশিক পরিষদ প্রার্থী ডা. ক্ষীতিশ চন্দ্র মন্ডল, পিরোজপুর মহকুমা আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং পিরোজপুর কাউখালী-ভান্ডারিয়া-কাঠালিয়া আসনের জাতীয় পরিষদ প্রার্থী এ্যাডভোকেট এনায়েত হোসেন খান, নাজিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক নিখিল রঞ্জন হালদার এবং বঙ্গবন্ধুর সফর সঙ্গীদের মধ্য হতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাজী নুর উদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ১৫ মিনিটের ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শোষষ-বঞ্চনা, নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা দিয়ে বাঙালীদের মুক্তির সনদ ৬-দফা দাবি আদায়ে নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত পরশু ১২ নভেম্বর ভোলসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ নারী-পুরুষ, শিশু প্রাণ হারিয়েছে, সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে, দুর্গত এলাকায় হাজার হাজার মৃতদেহ নদ-নদী খালে ভাসছে, জীবিতরা অনাহারে ধুকে ধুকে মরলেও এখন পর্যন্ত এক মুঠো ত্রাণের চাল সেখানে সরকার পাঠায়নি।
তিনি এখান থেকেই সরাসরি ভোলা যাবেন এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়াবেন বলে জানান। এ সময় তিনি এ কে ফয়জুল হক ও ডা. ক্ষীতিশ চন্দ্র মন্ডলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার এ দুজন প্রার্থীকে আপনাদের কাছে রেখে গেলাম। এদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে আমার হাত শক্তিশালী হবে।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে বঙ্গবন্ধু দ্রুত হেঁটে স্পিড বোটে চড়ে ভোলার দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যাত্রা করেন। ডিসেম্বরের ৭ ও ১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বরিশাল জেলার সবকটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়। নাজিরপুর-বানারিপাড়া-স্বরূপকাঠী এলাকাটিতে বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি থাকলেও বঙ্গবন্ধুর এক ভাষণে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। এ কে ফয়জুল হক ও ডা. ক্ষীতিশ চন্দ্র মন্ডল ন্যাপ প্রার্থী ডা. কালিদাশ বৈদ্য এবং আব্দুস সত্তার মিয়ার জামানত বাজেয়াপ্ত করে বিজয়ী হন। সেদিন মঞ্চে উঠে বঙ্গবন্ধুর গলায় গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক শেখের ১৩ বছর বয়সী পুত্র বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান শ ম রেজাউল করিম।
সেদিনের স্মৃতি চারণ করে আবেগআপ্লুত কণ্ঠে জানালেন, আমার জীবনের সবচেয়ে গর্ব হচ্ছে আমি এক মহানায়কের গলায় মালা দিতে পেরেছি এবং তিনি আমাকে আদর করেছেন। স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করা দশম শ্রেণির ছাত্র মো. আবুল বাশার স্মৃতিচারণ করে বললেন, কলেজ মাঠটি কাণায় কাণায় পূর্ণ হয়েছিল। কলেজের সমগ্র এলাকার রাস্তায় তিল রাখার জায়গা ছিলো না। বঙ্গবন্ধু চলে যাবার পরও হাজার হাজার মানুষ বাঙালীর এই মুক্তির দূতকে একনজর দেখে তার নেতৃত্বে শোষণ-বঞ্চনার মুক্তির সংগ্রামে শপথ নিতে ছুটে এসেছিল।