ঢাকা, ২৯ জুলাই (বাসস) : পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলায় বাস করে রুবি। বয়স ২০ বছর। তিন বছর আগে একটি একটি পুত্র সন্তান হয়েছে তার। আবারও সন্তান সম্ভাবা সে। পরিবারের সকলের ইচ্ছে এবার একটি কন্যা সন্তান হবে রুবির। কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখা গেলো এবারও পুত্র সন্তান হবে। সকলের মন খারাপ হয়ে গেলো। রুবির প্রতি দেখা গেল অযন্ত আর অবহেলা। যতই দিন যাচ্ছে রুবির প্রতি সকলের অযন্ত আর অবহেলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার দিন ঘনিয়ে এলো। বাড়িতেই সন্তান জন্ম নেবে এমন ধারণা সবার। গ্রামের প্রবীণ দাইকে খবর দেয়া হলো। কিন্তু অপুষ্টি আর অযন্তে শারীরিক অবস্থা তার বেশী ভালো ছিল না। এক সময় প্রসব জটিলতা দেখা দেয়। স্বামী সাহান মিয়া জরুরি ভিত্তিতে একটি ভ্যান রিকশা দিয়ে উপজেলা সদরের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করে দেয় রুবিকে। অবশেষে একটি সুস্থ্য পুত্র সন্তান জন্ম নেয়।
আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহ আইনত: নিষিদ্ধ হলেও এখন পর্যন্ত গ্রামগঞ্জে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিয়ের বছর পার না হতেই তারা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সে সময় হয়তো কিশোরীর শরীর অপূর্ণই থেকে যায়। তারপর সে যখন মা হতে যায়, তখন তার সংকট দেখা দেয় চারদিক থেকে। গ্রামাঞ্চলে অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার অনেক বেশী। কারণ তাদের অনেকেই দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। অশিক্ষা কুসংস্কারের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় এ সব মানুষকে। সচেতনতার অভাবে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে পদে পদে, থাকে পঙ্গুত্বের ঝুঁকি। সন্তান ধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার নারীর মৃত্যু ঘটে। সে সাথে জন্মের চার সপ্তাহের মধ্যে এক লাখ বিশ হাজার নবজাতকের মৃত্যু হয়। বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৯০ জন ও নবজাতকের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩৭ জন।
গর্ভকালীন জটিলতা, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা ও পরিবারের অবহেলা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ। এ অবস্থা পরিবর্তনে সরকার জনসচেতনামূলক কার্যক্রম আরম্ভ করেছে। দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার কল্যাণ কর্মীদের এসবিএ প্রশিক্ষণ দিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় মাতৃস্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রসূতি মায়ের দক্ষ সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সহস্রাব্দের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী মাতৃমৃত্যুর হার চার ভাগের তিন ভাগ কমিয়ে ১৪৩ ও নবজাতকের মৃত্যুর হার তিন ভাগের দুই ভাগ কমিয়ে প্রতি হাজারে ২১-এ অর্জনে বদ্ধপরিকর। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মায়েরা যাতে হাতের কাছে মাতৃ স্বাস্থ্য সুবিধা পান সে লক্ষ্যে প্রতি ছয় হাজার জনগোষ্ঠীরা জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শহরের বস্তি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চর, হাওড়-বাওড় ও পার্বত্য এলাকায় নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্বুদ্ধকরণ ও সেবা কার্যক্রম। ১৯৯৮ সাল থেকে দেশব্যাপী ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালন শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ৫৬ শতাংশ নারী প্রসব পূর্ববর্তী সেবা পান। এই হার ১শ’ শতাংশে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত মাতৃমৃত্যু বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনেকেরই সহজ দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, আর্থিক অস্বচ্ছলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ইত্যাদির কারণে প্রসব পূর্ববর্তী সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
নারীর মাতৃত্বকে নিরাপদ করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে বাল্যবিবাহ রোধ। প্রতিটি পিতা-মাতার উচিত তার সন্তানকে ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে না দেয়া। কারণ এর আগে মেয়েদের জননতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। নারী হিসেবে সংসার পরিচালনার মানসিকতা গড়ে ওঠে না। এ ছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কেও থাকে অজ্ঞ।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে গর্ভকালীন মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। অথচ আমাদের দেশের অবস্থান কত পেছনে। একবিংশ শতাব্দীর গর্বিত মানুষ আমরা। নারী নিরাপদে মা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে আমাদেরকে। গর্ভ অবস্থায় এবং গর্ভ-পরবর্তী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে প্রতিটি নারীর। এ অধিকার তাদের দিতে হবে। নারীর মাতৃত্বের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে স্বামী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। তাদের অধিকার পূরণ হলে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারলে, আর জটিলতা দ্রুত মোকাবেলা করতে পারলেই নারীর মাতৃত্বে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। |