বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে : পিআরআই
ঢাকা, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আজ ‘টুওয়ার্ড আ ক্যাশলেস ইকোনমি: এ স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক পরামর্শ কর্মশালা আয়োজন করেছে। কর্মশালাটি পিআরআই-এর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অর্থনীতিবিদ, আর্থিক খাতের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। তারা বাংলাদেশে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেন এগিয়ে নিতে করণীয়, চ্যালেঞ্জ ও নীতি অগ্রাধিকারের বিষয়ে আলোচনা করেন। আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
পিআরআইয়ের উপস্থাপনায় বলা হয়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নেতৃত্বে দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এখনো নগদ অর্থনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।
গবেষণায় ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সীমিত ইন্টারঅপারেবিলিটি, অবকাঠামোগত ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কম ডিজিটাল সাক্ষরতার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তরের ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, লেনদেন ব্যয় হ্রাস এবং অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা উন্নত হয়। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শক্তিশালী ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো এবং সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামো এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত রোডম্যাপে ধাপে ধাপে সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং ফিনটেক উদ্ভাবন উৎসাহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তর সম্ভব হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খান। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল পেমেন্ট, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং নিরাপদ পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তরের সাফল্য নির্ভর করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের ওপর, যাতে এই রূপান্তর সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।’
কর্মশালার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, মানব সভ্যতার লেনদেন পদ্ধতি এক ধরনের পূর্ণ চক্রে ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘যখন হোমো স্যাপিয়েন্স প্রথম পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে, তখন সব লেনদেনই ছিল পণ্য বিনিময়ভিত্তিক। পরে নগদ অর্থ একটি বড় আবিষ্কার হিসেবে আসে। হাজার হাজার বছর পর সেই নগদ অর্থই এখন আর্থিক লেনদেনে জটিল হয়ে উঠেছে, ফলে আমরা আবার ক্যাশলেস সমাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।’
তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে তিনটি প্রধান উপাদান কাজ করে-শ্রমশক্তির বৃদ্ধি, মূলধন বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি। ক্যাশলেস অর্থনীতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, তবে এই অর্থনীতিতে সৃষ্ট মূল্য সঠিকভাবে পরিমাপ ও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ড. জাইদি সাত্তার বলেন, ডিজিটাল ও ক্যাশলেস লেনদেনের মাধ্যমে সৃষ্ট মূল্যকে জাতীয় উৎপাদনে প্রতিফলিত করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) জাতিসংঘের সিস্টেম অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস (ইউএন এসএনএ) ২০২৫ গ্রহণ করতে হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বিবিএস এবং গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রাপ্তিও গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য একটি কৌশলগত রোডম্যাপ প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রথম পরামর্শ সভা আয়োজন করেছি।’
তিনি বলেন, ক্যাশলেস এজেন্ডাকে এখন জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারে উন্নীত করতে হবে। ডিজিটাল ও ক্যাশলেস উপকরণ আর প্রান্তিক উদ্ভাবন নয়; এগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং কম লেনদেন ব্যয়সম্পন্ন অর্থনীতির শক্তিশালী সহায়ক। সঠিকভাবে নকশা ও বাস্তবায়ন করা হলে এসব ব্যবস্থা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা সম্প্রসারণ, অনানুষ্ঠানিকতা হ্রাস, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা জোরদার করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা-যা নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রযুক্তি অংশীদাররা বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন। যদি বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চায়, তবে ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তর হতে হবে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও সময়বদ্ধ। এই পরামর্শ সভা সেই লক্ষ্যের প্রথম ধাপ।’
পরবর্তী উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয়, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি এবং ফিনটেক উদ্ভাবনের ভূমিকা নিয়ে মতামত দেন।
কর্মশালার সমাপনী বক্তব্য রাখেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম। তিনি বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর এজেন্ডা এগিয়ে নিতে প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও গবেষণায় পিআরআইয়ের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
কর্মশালায় পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল এইচ. খন্দকারও উপস্থিত ছিলেন।