শিরোনাম
দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ
কুমিল্লা, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (বাসস) : অভাবের সংসারে পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানির ডেলিভারি ম্যানের কাজ করতেন মাদ্রাসা ছাত্র মোশাররফ। কিন্তু তাতে যা আয় হতো তা দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিলোনা। এ অবস্থায় আত্মকর্মসংস্থানের পথ খোঁজেন তিনি। শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং। আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রমের ফলে অল্পদিনেই সাফল্যের মুখ দেখেন। বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং থেকে তার মাসিক আয় প্রায় দুই লাখ টাকা।
ফ্রিল্যান্সার মোশাররফ জানান, সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়ার খরচ চালাতে কয়েকটি কোম্পানিতে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করেছি। কিন্তু অল্প বেতনে নিজের লেখাপড়া ও পরিবারের খরচ বহন করা কষ্ট হচ্ছিলো। পরে বিকল্প চিন্তা করতে লাগলাম। চাকরির বিকল্প চিন্তা থেকেই ফ্রিল্যান্সিং-এ আসা।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বৈদ্যেরখিল গ্রামের ভ্যানচালক খোরশেদ আলম ও হাছিনা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ পুত্র মোশাররফ হোসেন। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। এক ভাই ইলেকট্রিক এর কাজ করেন। মোশাররফ চৌদ্দগ্রামের স্থানীয় নজমিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। বর্তমানে একই মাদ্রাসায় ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করছেন।
মোশাররফ ২০২১ সালে মায়ের দেয়া ৪০ হাজার টাকায় একটি সাধারণ কম্পিউটার কেনেন। তারপর ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে বিভিন্ন টিপস নিয়ে নিজেকে তৈরি করেন। অনলাইনেই শিখে নেন ফ্রিল্যান্সিং-এর কৌশল। শুরুতেই ২০ ডলার আয় করে আগ্রহ বেড়ে যায়। এই আয় থেকেই ২০২৪ সালে ‘বেস্ট আইটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এই ট্রেনিং সেন্টারে বর্তমানে ট্রেনিং নিচ্ছেন প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী। আগামী দিনে উপজেলার সহস্রাধিক বেকার যুবাকে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে তৈরি করে আত্মকর্মসংস্থানের পথ দেখাবেন বলে জানালেন মোশাররফ।
বাসসের সাথে আলাপকালে মোশাররফ বলেন, ২০১৯ সালে স্থানীয় চৌদ্দগ্রাম বাজার থেকে আমি বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। পরে মায়ের কাছে অনেক অনুরোধ করেছিলাম একটি কম্পিউটার কেনার জন্য। মা সুদে ধার করে আমাকে ৪০ হাজার টাকা এনে দেন। ঐ টাকা দিয়ে আমি একটি কম্পিউটার কিনি। পরে আমি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং এর বিষয়ে জানতে পারলাম। এরপর কয়েকটা অনলাইন কোর্স করি। এতে জ্ঞানের পরিধি খুব একটা না বাড়লেও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি। আরো বিস্তারিত জানতে ইউটিউব ঘাটাঘাটি করে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ খুঁজতে শুরু করি।
তিনি বলেন, ২০২১ সালে ফ্রিল্যান্সিং-এর জন্য আমি অনলাইনে একটি একাউন্ট খুলি। প্রথমে অনলাইনে কোন অর্ডার বা কাজ পাচ্ছিলাম না। কয়েক মাস পর আউট অফ মার্কেট প্লেসে কাজের জন্য অফার পাঠাই। এর কয়েকমাস পর পর্তুগালের একটা ক্লায়েন্টের কাজের অর্ডার পাই এবং সুন্দরভাবে কাজ শেষে করে অনলাইনে কাজ করে প্রথম ২০ ডলার আয় করি। এর পরে কয়েক মাস আবার কাজ পাইনি। পরে পর্তুগালের ক্লায়েন্টকে আবার কাজের জন্য মেসেজ দেই। তিনি আবার আমাকে কাজ দেন। এভাবে একের পর এক আমি পর্তুগালের কাজ করতে থাকি। এখন সব কাজ আমার নিজস্ব ফাইবারেই করি। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে এলাকায় একটি আইটি সেন্টার খুলেছি। সব মিলিয়ে আমার মাসে এখন ২ লাখ টাকার উপরে আয় হয়। আমার প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী এখন নিজে নিজে অনলাইনে আয় করছে।
মোশাররফের মা হাছিনা বেগম বাসসকে বলেন, আমার স্বামী ভ্যান চালিয়ে কোন রকম পরিবার চালাতো। পরিবারের হাল ধরার জন্য ধার দেনা করে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলাম। ছেলে রাজি হয়নি। দেশেই সে কিছু করার আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে বহু কষ্ট করে প্রতিবেশি থেকে ধার করে ছেলেকে ৪০ হাজার টাকা দিয়েছি। বর্তমানে স্বামী অসুস্থ ঠিকমত ভ্যান গাড়ি চালাতে পারে না। ছেলেই পরিবারের সব দেখাশুনা করছে।
মোশাররফের বাবা খোরশেদ আলম বলেন, আমি একজন ভ্যান চালক। অনেক কষ্ট করে পরিবারের ভরণপোষণ করি। ছেলের আগ্রহ দেখে তাকে কষ্ট করে একটি কম্পিউটার কিনে দিয়েছিলাম। ছেলে এখন অনলাইনে ভাল আয় রোজগার করে পরিবারের দায়িত্ব পালন করছে।
মায়ের দেয়া ৪০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে মোশাররফ ফ্রিল্যান্সিং করে জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সদরে এখন প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকার একটি ট্রেনিং সেন্টারের মালিক হয়েছেন। শুধু তাই নয়, ফ্রিল্যান্সিংয়ের উপার্জিত টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা করিয়েছেন। তৈরি করেছেন আধপাকা একটি বাড়ি।
বেস্ট আইটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার-এর শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই আউসোর্সিং করে আয় করছেন। তারা আগামী দিনে মোশাররফের মত আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অনলাইন প্লাটফর্মে কাজ শিখছেন।
স্থানীয়রা জানান, কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকা চৌদ্দগ্রামে মাদক ও চোরাচালানীসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে ফিরিয়ে আনতে বেকার যুবক-যুবতীদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন।