শিরোনাম
॥ মো. মামুন ইসলাম ॥
রংপুর, ২৯ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : রংপুরের নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ঈদ-উল-ফিতরের আমেজ শুরু হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নাগালে আসায় এখন তারা ঈদের কেনাকাটাসহ যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।
আয়বর্ধক কার্যক্রম (আইজিএ), সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা এবং এই মৌসুমে বালুকাময় চরাঞ্চলে প্রচুর ফসল ফলনের ফলে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে, চরের মানুষ এখন শেষ মুহূর্তে ঈদের জিনিসপত্র কিনতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এর আগে, চরের মানুষদের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র তাদের ভাগ্যকে গ্রাস করেছিলো। অন্যদিকে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, কুসংস্কার, অপুষ্টি এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন সুবিধার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিলো।
তবে, চরাঞ্চলের পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেখানে মানুষ আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রংপুর-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘নর্থবেঙ্গল ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’র চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সামসুজ্জামান বলেন, চরের মানুষের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার এখন বেশ উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চরাঞ্চলে ব্যাপক সামাজিক সুরক্ষা-জাল, উন্নয়ন, প্রেরণামূলক কার্যক্রম এবং ফসল চাষ বাস্তবায়নের পর চরের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।’
ফলস্বরূপ, চরাঞ্চলে এখন ঈদের আনন্দ বিরাজ করছে। সেখানে চরের মানুষ একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং উন্নত জীবিকা অর্জন করতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ক্রমাগত সরকারি-বেসরকারি সংস্থার (জিও) সহায়তা এবং ফসল চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সামাজিক অভিশাপগুলো এখন দূর হয়েছে।
সামসুজ্জামান বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমেছে এবং চরের মানুষদের জীবনযাপন করতে সাহায্য করেছে। তাদের বেশিরভাগই এখন ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের জন্য পোশাক এবং অন্যান্য ঈদ সামগ্রী কিনছেন।’
চরের মানুষ এখন তাদের চাষ করা ফসল সংগ্রহ করছেন এবং বাজার মূল্যের সঙ্গে ভালো ফলন পাচ্ছেন এবং আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর পূর্ব মহিপুরের ফেন্সি বেগম এবং শাহিনুর ইসলাম দম্পতি জানিয়েছেন যে তারা তিস্তা নদীরতীরে চরের দুই একর জমিতে তাদের চাষ করা বেশিরভাগ ফসল যেমন- কুমড়া, ক্ষীরা, কাঁচামরিচ এবং অন্যান্য ফসল সংগ্রহ করছেন।
এই দম্পতি ইতিমধ্যেই ১ লাখ টাকায় কাটা ক্ষীরা, কুমড়া এবং অন্যান্য ফসল বিক্রি করেছেন এবং আগামী মে মাসের মধ্যে ফসল কাটা শেষ করার পর সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে ২ লাখ টাকার নিট মুনাফা অর্জনের আশা করছেন।
ফ্যান্সি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের নতুন কাটা ফসল বিক্রি করে অর্জিত অর্থ দিয়ে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের জন্য সন্তানদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক এবং অন্যান্য ঈদের জিনিসপত্র কিনেছি।’
উপজেলার পশ্চিম মহিপুর গ্রামের চরের মানুষ মোজাম্মেল হক, নূর ইসলাম, মাহবুব আলম এবং আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন যে তারা ইতিমধ্যেই তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদ-উল-ফিতর উৎসব উদযাপনের জন্য ঈদের পোশাক এবং অন্যান্য জিনিসপত্র কিনেছেন।
ওই গ্রামের কবিজা বেগম এ কথা বলেন- ‘আমরা চরাঞ্চলে ফসল চাষ, পশুপালন এবং অন্যান্য আইজিএ-এর মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করছি।’ তিনি আনন্দের সঙ্গে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করার আশা প্রকাশ করেন।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের চর তালুক শাহবাজ গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, এই মৌসুমে তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে তার চাষকৃত ফসলের লাভজনক দামের সঙ্গে তিনি বাম্পার ফলন পাচ্ছেন।
আমিনুল বলেন- ‘আমি চরাঞ্চলে আমার চাষকৃত চীনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন এবং শাকসবজির উৎকৃষ্ট উৎপাদন পাচ্ছি এবং বাজার মূল্যও ভালো যাচ্ছে। তাই শিশু ও পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক এবং অন্যান্য ঈদের জিনিসপত্র কিনেছি।
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পিএইচডি ফেলো মো. মামুনুর রশিদ বলেন, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির পর চরের মানুষ ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিবেশ ও চর জীবন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ মামুনুর রশিদ আরও বলেন- ‘রংপুর অঞ্চলের চরাঞ্চলে ঈদের আমেজ বিরাজ করছে, যেখানে মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের জন্য ঈদের জিনিসপত্র কিনতে ব্যস্ত।’