শিরোনাম
মো. মামুন ইসলাম
রংপুর, ২ এপ্রিল, ২০২৫ (বাসস) : বিনোদনপ্রেমীরা পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের পর দ্বিতীয় দিনেও প্রচন্ড গরম আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে রংপুরের বিনোদন কেন্দ্রেগুলোতে উপচেপড়া ভীড়ের মাঝে আনন্দমুখর পরিবেশে নিজেদের সুন্দর সময় উপভোগ করছেন ।
রংপুর ও আশেপাশের জেলাগুলুর দর্শনীয় স্থান, বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র, নদীর উপর নির্মিত সেতূ, পার্কসহ আকর্ষণীয় স্থানগুলো এখন তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতি, নারী-পুরুষসহ সকল বয়সী মানুষের প্রচন্ড ভীড়ে লোকারণ্য হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে ঈদের পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে রংপুরের দর্শনীয় স্থান, বিনোদন কেন্দ্র ও শিশু পার্কগুলো ঘুরে সকল বয়সী মানুষের ব্যাপক ভীড় দেখা যায়। ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশী। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর এক মুক্ত পরিবেশে
সকল বিনোদন প্রেমীদের চোখে-মুখে ছিল অনাবিল আনন্দ আর উচ্ছাসের ছাপ।
শিশু ও শিশু-কিশোরদের সঙ্গে ঈদের আনন্দে বেরিয়েছেন তাদের অভিভাবকরাও।
বুধবার সকাল থেকে রংপুর চিড়িয়াখানা ও পাশের সুরভি বিনোদন উদ্যানসহ শিশুপার্ক, তাজহাট জমিদার বাড়ি ও জাদুঘর, সিটি চিকলি বিনোদন পার্ক, প্রয়াস সেনাপার্ক, চিকলি ওয়াটার পার্ক ও রূপকথা থিম পার্কে টিকিটের জন্য দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন দেখা যায়।
টিকিট কেটে প্রবেশ করতেও যেন রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে ভ্রমনপিপাশু বিনোদনপ্রেমীদের।
এছাড়াও নগরীর টাউন হল চত্বর, ডিসির মোড়, কাউনিয়ার শতবর্ষী তিস্তা রেলওয়ে সেতু, গঙ্গাচড়া মহিপুর তিস্তা সড়ক সেতু পয়েন্টসহ রংপুর জিলা স্কুল মাঠের বৈশাখী বটতলা, ক্যান্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ সংলগ্ন ফ্লাইওভার, আরএএমসি চত্বর,পায়রা চত্বরসহ নগরীর দর্শনীয় স্থানজুড়ে এখন মানুষের ঢলে যেনো জনমুদ্রের রূপ ধারণ করেছে। এসব স্থানে যেতে আবার দীর্ঘ যানজটের মুখে পড়ছেন বিনোদন প্রেমীরা।
এবার রংপুর চিড়িয়াখানায় নতুন কিছু বন্যপ্রাণীর সংযোজন হওয়ায় শিশু কিশোরদের উপস্থিতি বেড়েছে। চিড়িয়াখানার ভেতরে প্রবেশের পর এক খাঁচা থেকে আরেক খাঁচায় হেঁটে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন পশু-পাখি দেখছেন। আর বড়রা তাদের শিশুসন্তানকে বিভিন্ন পশুপাখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে সিংহের খাঁচার সামনে। পশুর রাজাকে দেখে শিশুরাও বেশ খুশি। বানরের ভেংচি কাটা আর লাফালাফি দেখতে বানরের খাঁচার সামনেও ছিল দর্শনার্থীর ভিড়।
এছাড়া সেখানে কুমির, ঘড়িয়াল, জলহস্তি, ঘোড়া, হনুমান, গাধা, ভাল্লুক, হরিণ, ময়ূর, উটপাখিসহ সবগুলো খাঁচার সামনেই ছিল ব্যাপক ভীড়।
চিড়িয়াখানার ভেতরে শিশুপার্কের ভেতরে দলবদ্ধভাবে ঘুরছিল শিশু জান্নাত, কনিকা, ফুয়াদ, মানসী, আব্রার, ফাহাদ, রবি, পিনকী, জহির, সুজান্না ও আরমান সহ আরো অনেকে।
তাদের সাথে আলাপকালে সুজান্না জানায়, সেখানে এসে তারা অনেক আনন্দ ও মজা পেয়েছে।
তবে শিশু পার্কের রাইডগুলোর আসন ফাঁকা না থাকায় সেখানে বেশী ভিড় হওয়ায় শিশুরা রাইডে উঠতে পারছে না।
সেখানে বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে রোস্টার। সেইসঙ্গে গ্রামীণ চিত্রের অবয়ব ছবি তোলা আর আড্ডা দেওয়া সব মিলিয়ে আনন্দ বেড়েছে কয়েকগুন। ‘আই লাভ’ প্রতিক জড়িয়ে ছবি তোলার হুড়োহুড়ি দেখা গেছে।
সেখানে ভয় আর রোমাঞ্চের জন্য ভুতের ঘর সংসার রয়েছে। সেখানে অনেকের প্রবেশে ভয় কাজ করলেও ভালোই লাগে বলে জানিয়েছে শিশু-কিশোররা।
অন্যদিকে রংপুর সিটি করপোরেশন দ্বারা পরিচালিত রংপুর সিটি চিকলি বিনোদন পার্ক সাজানো হয়েছে শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করার মতো নানা আয়োজন। বিলের বুকে স্পিডবোট চলছে দ্রুত বেগে এ পাশ থেকে ওপাশ। হই হুল্লোড়ে মেতে উঠছে সবাই। আর স্পিডবোটের ছুটে চলার বেগে বড় বড় ঢেউ এসে ধাক্কা দিচ্ছে বিলের দুই কূলে। ছিটকে আসা জলরাশিতে মজা করছেন ছোট-বড় সব বয়সী মানুষ। এই পার্কের বিপরীতে ইসলামপুর হনুমানতলা রোডে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন চিকলি ওয়াটার পার্ক। সেখানে উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। বিলের পানির মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা ধরণের রাইড। কৃত্তিম পাহাড়ি ঝর্ণাধারা। পার্কে বসার চেয়ারগুলো ওয়েষ্টার্ণ প্যাটার্ণের হওয়ায় বসার আগ্রহ দেখা গেছে অনেকের। সব মিলিয়ে ওয়াটার পার্কে রংপুর জেলার বাইরের জেলা থেকেও এসেছেন অনেক বিনোদনপ্রেমী মানুষ।
একই চিত্র দেখা গেছে রংপুর নগরী থেকে একটু দূরের খলেয়া গঞ্জিপুরের ভিন্নজগত বিনোদন কেন্দ্র, পীরগঞ্জের আনন্দনগর, বদরগঞ্জের মায়াভুবন, কাউনিয়ার তিস্তা পার্ক, পীরগাছার আলী বাবা থিম পার্কেও। ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের মাঝে ঈদ উদযাপনের খোরাক যোগাচ্ছে এসব বিনোদনকেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থান।
রংপুর মহানগরীর উপকন্ঠে বদরগঞ্জ রোডে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত নিসবেতগঞ্জের রক্ত গৌরব চত্বর এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক। ঘাঘট নদীর অংশ বিশেষসহ পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত নিচু এলাকায় সবুজে সাজানো এই বিশাল পার্কের পরিবেশ কোলাহলমুক্ত। এ পার্কটি সেনা সদস্যদের নিখুঁত কারিগরি পরিকল্পনায় বাঁশ ব্যবহার করে সাজানো হয়েছে। পার্কসহ ঘাঘটের আশপাশ ঘুরে দেখতে সেখানে ভিড় করছেন বিনোদন পিপাসুরা।
রংপুর মহানগরী থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার পূর্বে কাউনিয়া তিস্তা রেলসেতু। তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত এই রেলওয়ে সেতুর পাশে ২০১২ সালে তিস্তা সড়ক সেতু তৈরি করা হয়েছে। গোধূলীবেলার মায়াবী সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীদের আড্ডার আসর জমছে তিস্তাপাড়ে। তিস্তা বাজার সড়কে নজর কাড়ছে দৃষ্টিনন্দন তিস্তাপার্ক। নদীময় প্রকৃতিতে স্বস্তির বিনোদন পেতে এখানে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের মানুষের আগানোগা বেড়েছে কয়েকগুন।
একই চিত্র দেখা গেছে গঙ্গাচড়ার মহিপুর ব্রীজ ঘাটে। তিস্তা নদীবেষ্টিত এই ঘাটে রংপুর-লালমনিরহাট জেলার মানুষের পারাপারে নির্মিত তিস্তা সড়ক সেতু। এই সেতুর নিচের একপ্রান্তে পানিতে ছুটে বেড়াচ্ছে নৌকা আর ছোট ছোট স্পিডবোট। সেতুর আরেক প্রান্তে বিশাল বালুচর। মনোরম পরিবেশে নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় উঠে ঘুরছে অনেকেই। আবার কেউ কেউ ধুধু বালুচরে প্রিয়জনের হাত ধরে হেঁটে হেঁটে গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। এখানে সেতুর দুই প্রান্তে একটি ভাসমান ও অভিজাত রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে মুখরোচক বাহারি খাবারের দোকানে ভোজন রসিকদের ভীড় দেখা যায়।
রংপুর বিনোদন উদ্যান ও চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. আমবার আলী তালুকদার বাসস’কে জানান, গত কয়েকবছর থেকে এবারে দর্শনার্থী বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সবাই আনন্দ চিত্তে ফুরফুরে মেজাজে চিড়িয়াখানা ঘুরছেন। শিশুরা খুবই আনন্দ উচ্ছাসে সময় কাটাচ্ছেন। বিনোদন প্রেমীদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে পুলিশ সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে। তাছাড়া পুরো চিড়িয়াখানা সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত।
ট্যুরিস্ট পুলিশ রংপুর জোনের পুলিশ পরিদর্শক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, রংপুরের সকল বিনোদন কেন্দ্রে পুলিশ রয়েছে। সেইসঙ্গে সাদা পোশাকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। সবখানেই আনন্দমুখর পরিবেশ নিরাজ করছে।