বাসস
  ২৪ মার্চ ২০২৫, ০৯:১১

‘মা অনবরত গুলি হচ্ছে’ : মায়ের সাথে শহীদ ফয়েজের শেষকথা

শহীদ ফয়েজ আহমদ - ছবি : বাসস

প্রতিবেদন : আব্বাছ হোসেন

লক্ষ্মীপুর, ২৪ মার্চ, ২০২৫ (বাসস) : ‘মা অনবরত গুলি হচ্ছে। পরে কথা বলব।’ কিন্তু মায়ের সাথে আর কথা বলা হল না রায়পুরের বাসিন্দা স্যানিটারি মিস্ত্রী ফয়েজ আহমদের (৩১)। ২১ জুলাই সন্ধ্যার আগে ছেলের খোঁজ নিতে ফোন করেন মা সবুরা বেগম। মায়ের ফোন পেয়ে ফয়েজ মাকে জানান, তিনি ভালো আছেন। কাজ শেষে বাসায় ফিরছেন। তবে, প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছে। বাসায় গিয়ে পরে কথা বলবেন।

শহীদ ফয়েজের পরিবার

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চর আবাবিল ইউপির ঝাউডগী এলাকায় শহীদ ফয়েজ আহমদের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তিন সন্তানের মধ্যে ফয়েজ আহমেদ ছিলেন সবার বড়। তার উপার্জন দিয়েই চলত তাদের সংসার।

সন্তানের জন্য এখনও হাউমাউ করে কান্নাকাটি করেন শহীদ ফয়েজ আহমদের মা সবুরা বেগম ও বাবা আলাউদ্দিন। ছেলের সাথে সে দিনের ফোনে কথা বলার ও অতীতের নানা স্মৃতি তুলে ধরে বিলাপ করে কাঁদেন বৃদ্ধা সবুরা বেগম। বাবা বৃদ্ধ আলাউদ্দিনও ছেলেকে হারিয়ে বাকহারা হয়ে গেছেন।

ফয়েজের মৃত্যু

সাবুরা বেগম বলেন, ‘২১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে ছেলের সাথে কথা বলার সময় মোবাইলে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এ সময় গুলির একটি বিকট শব্দের পর ছেলের সাথে তার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়।’ 

ছেলেকে হারিয়ে দু’চোখে তিনি কেবলই অন্ধকার দেখছেন। কী হবে এখন? ফয়েজের স্ত্রী ও শিশু নাতির কী হবে? কে যোগাড় করে দেবে তাদের মুখের আহার? এসব ভাবতে ভাবতে দিন কাটে তার। আর দু’চোখ বেয়ে ঝরে পড়ে নোনা জলের ধারা।

সহকর্মী কাশেমের বর্ণনা

পরিচিত স্যানিটারি ঠিকাদার মো. কাশেম গুলিবিদ্ধ ফয়েজ আহমদকে হাসপাতালে নিয়ে যান। মোবাইল ফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ফয়েজ তাঁর সঙ্গে দুই বছর ধরে কাজ করছিলেন। দিনে ৭০০ টাকা মজুরি পেতেন। সামান্য এই আয় দিয়ে স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে সাইনবোর্ড এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

তিনি আরো বলেন, ‘২১ জুলাই বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সাইনবোর্ড এলাকার একটি ভবনে কাজ শেষ করে বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ফয়েজের মাথায় ও ঘাড়ে গুলিবিদ্ধ হন।’

অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মো. ফয়েজ আহমদকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার লাশ রায়পুরের ঝাউডগী গ্রামের বাড়ি নিয়ে দাফন করা হয়। তবে ফয়েজ গরীবের সন্তান হলেও অনেক ভদ্র স্বভাবের ছিলেন।

ফয়েজের মা-বাবা-মার বিলাপ 

প্রায় ১২ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যায় ফয়েজ। সেই থেকেই স্যানিটারি মিস্ত্রির (পাইপ ফিটার) কাজ করতেন। ওই দিন সন্ধ্যায় ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাতের খবর পেয়ে ছেলে মো. ফয়েজকে কল দেন তিনি।

এ সময় ফয়েজ বলেন, ‘মা অনবরত গুলি হচ্ছে। আমি কাজ শেষ করে বের হয়েছি। মা, এখন ফোন রাখো।’ এই কথাগুলোর এক পর্যায়ে হঠাৎ গুলির বিকট শব্দ পান তিনি। এরপর সব স্তব্ধ। ছেলের আর কোনো কথা শুনতে পাননি এই বৃদ্ধ মা সাবুরা বেগম।

ফয়েজের বাবা আলাউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুটি গুলি আমার ছেলেটারে শেষ করে দিল! ছেলে হত্যার বিচার চাই। আমি চট্টগ্রাম পোর্টে চাকরি করতাম। সেনা সরকারের সময় এক আন্দোলনে আমি চাকরি হারিয়েছি। এবার আরেক আন্দোলনে ছেলেকে হারালাম। আল্লাহর কাছে বিচার চাই।’

দোষীদের শাস্তি চাই

স্বামী ফয়েজ আহমেদ শহীদ হওয়ার পর তার স্ত্রী নুর নাহার ও তাঁর ১৮ মাস বয়সী ছেলে রাফি মাহমুদের ঠাঁই মিলেছে গাজীপুর জেলার টঙ্গীর এক আত্মীয়ের বাসায়। মোবাইল ফোনে কথা হলে কেঁদে কেঁদে নুর নাহার বলেন, ‘স্বামী ছিল আমার আশ্রয়, সম্বল সবকিছু। কোন দোষে তাকে গুলি করে মারল? দোষীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

খুনিদের বিচার হবে

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, শহীদ ফয়েজ আহমেদকে চরআবাবিলের ঝাউডগী এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এরপর থেকে শহীদ ফয়েজের স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তারা টঙ্গীতে থাকেন। প্রশাসন সবসময় তাদের পরিবারের পাশে রয়েছে। হত্যাকারীদের বিচার হবে বলে অঅশ্বাস দেন তিনি।

বিএনপি’র সমর্থন

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক এমপি আবুল খায়ের ভূইয়া বলেন, স্বৈরাচার হাসিনার পতনে ফয়েজ আহমেদসহ যারা শহীদ হয়েছেন, সবার পাশে রয়েছে বিএনপি। ইতোমধ্যে বিএনপি শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে তা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।